
নিজস্ব প্রতিনিধি
১০ লাখ টাকার চেক ডিজঅনার মামলায় এক বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা—আদালতের রায় মাথায় নিয়ে পলাতক আসামির খাতায় নাম উঠেছিল তাঁর। অথচ সাজা ঘোষণার ১০ দিন যেতে না যেতেই তিনি বাগিয়ে নিলেন দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ! এখানেই শেষ নয়, শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকে যোগ দিতে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেন দলীয় নীতিনির্ধারকদের আশপাশে।
পাবনার ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির নবমনোনীত সদস্য সচিব মো. ইমরুল কায়েস সুমনকে ঘিরে এখন স্থানীয় রাজনীতিতে তোলপাড়। আদালতের দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে এমন পদে বসানোয় ফ্ুঁসে উঠেছে দলের একাংশ ও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঈশ্বরদী শহরে বের করা হয়েছে ঝাড়ু মিছিল।এরই প্রতিবাদে রোববার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় ঈশ্বরদী শহরে ঝাড়ু মিছিল করেছেন দলের একাংশের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা

আদালত সূত্রে জানা যায়, ১০ লাখ টাকার চেক ডিজঅনারের এক নালিশি মামলায় গত ৬ আগস্ট পাবনার ১ম যুগ্ম দায়রা জজ আদালতের বিচারক এম. সারওয়ার জাহান আসামি ইমরুল কায়েস সুমনকে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়। পাবনার পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট গোলাম সারোয়ার খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গোলাম সারোয়ার জুয়েল জানান, সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী মুক্ত অবস্থায় থাকার কোনো সুযোগ নেই। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলেও জরিমানার ৫০ শতাংশ (৫০%) টাকা আদালতে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
এদিকে, স্থানীয় বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও গত ১৬ আগস্ট ইমরুল কায়েস সুমনকে ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সদস্য সচিব পদে মনোনীত করা হয়। এর পরদিন ২০ আগস্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ঢাকার গুলশানে বিএনপি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পাবনা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক বৈঠকে অংশ নেন তিনি। স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, সাজাপ্রাপ্ত আসামি সুমন পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। দন্ডাদেশের তথ্য গোপন করে হাবিব ইমরুল কায়েসকে পদায়ন ও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ বিএনপি নেতাকর্মীদের একাংশের।
ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিগত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হয়ে দল থেকে অব্যাহতি পাওয়া বিএনপি নেতা জাকারিয়া পিন্টু অভিযোগ করে বলেন, “আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামিকে আইনের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার জোরে দলীয় পদে বসিয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব। শুধু তাই নয়, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দলীয় বৈঠকে নিয়ে গিয়ে তারেক রহমানকেও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, ইমরুল কায়েস সুমন ঈশ্বরদীর চিহ্নিত প্রতারক্। সে আগেও ব্যাঙ্কের টাকা ঋণ জালিয়াতি করে পালিয়েছে। পাশাপাশি ঈশ্বরদী বিএনপির রাজনীতি ধ্বংস করতে ত্যাগীদের বাদ দিয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক পদে দন্ডপ্রাপ্ত হত্যা মামলার আসামি শরিফুল ইসলাম তুহিন ও পৌর বিএনপির সভাপতি পদে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারী মামলার আসামি মাহবুবুর রহমান পলাশকে মনোনীত করা হয়েছে।
দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রোববার সন্ধ্যায় ঈশ্বরদী পৌর শহরে ঝাড়ু ও প্রতিবাদ মিছিল বের করেন জাকারিয়া পিন্টুর সমর্থক ও তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা। মিছিল থেকে বিতর্কিত ও সাজাপ্রাপ্ত নেতা ইমরুল কায়েস সুমনের পদে স্থলাভিষিক্তকরণ বাতিল এবং জেলা নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস সুমন বলেন, বাদীর সাথে আমার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক লেনদেন ও দেনাপাওনা ছিলো। ইতোমধ্যে সেটি সমাধানে আলাপও হয়েছে তার সাথে। এরমধ্যে মামলার ডেট পড়ে, যেটি আমি বা আমার আইনজীবীর স্মরণ ছিলো না। ফলে পলাতক উল্লেখ করে রায় দেয়া হয়েছে। রায়ের বিষয়টিও আমার জানা ছিলো না। এখন শুনতেছি। আইনগতভাবে দ্রুতই এটির সুরাহা করা হবে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এড. মাসুদ খন্দকার বলেন, আল্লাহর ফেরেশতা দিয়ে কমিটি করলেও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বিভিন্ন মিছিল মিটিং হয়। সুমনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সে ব্যাপারে আমাদের কিছু জানা নেই। কেউ এব্যাপারে অভিযোগও করেনি। দন্ড প্রাপ্ত তো তারেক রহমান, খালেদা জিয়াও ছিলেন। মামলা ষড়যন্ত্রমূলক কিনা সেটা আগে দেখতে হবে।
তিনি দাবি করেন, নিয়ম মেনে যোগ্যদের দিয়েই কমিটি করা হয়েছে। তবে আইনগতভাবে কেউ দন্ডপ্রাপ্ত হলে গঠনতন্ত্র অনুসারে দলের নেতৃত্বে তার আসার সুযোগ নেই।
Leave a Reply